ঘুম থেকে উঠেই ড্রেসিংটেবিলের উপর রাখা একগুচ্ছ গোলাপের দিকে দৃষ্টি
আটকিয়ে যায় নিশাতের!! নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না! ভাবছে মনে হয়
স্বপ্ন দেখছে সে!! গায়ে চিমটি কেটে শিওর হয়ে নেয়!! না... এতো স্বপ্ন
নয়..... এতো বাস্তব.....
এতো সুন্দর করে একগুচ্ছ গোলাপতো শুধু একজনই
বাঁধতে পারে কিন্তু সেতো অনেক আগেই হারিয়ে গেছে!! হৃদয়ের মাঝে ধীরে ধীরে
গড়ে উঠা স্বপ্নকে কাচের টুকরোর মতো ভেঙ্গে ছারখার করে দিয়েছে!! জীবনের আশার
প্রদীপ এক নিমিষেই নিভিয়ে দিয়ে চলে গেছে অনেক দূরে!! যাকে মনে রাখার কারনে
জীবনকে নতুনভাবে গড়ে নিতে ব্যর্থ হয়েছে!
কথাগুলো ভাবতে ভাবতেই
ফুলের মাঝে থাকা এক টুকরো কাগজের দিকে চোখ আটকে যায় নিশাতের!! সেই পরিচিত
হাতের লেখা...... একই ধরনের অভিব্যক্তি..... নিশি.....
"নিশি
তোমাকে কিভাবে সম্বোধন করব বুঝতে পারছি না! তোমাকে অভিবাধনের ভাষা অনেক
আগেই হারিয়ে ফেলেছি!! নিজের মনের মাঝে গড়ে উঠা পাহাড়সম দুঃখে সবকিছু চাপা
পড়ে আছে!! সেখান থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কোন উপায় খুজে পাইনি!!
জানি
না তোমার মনের মাঝে আমার জন্য ভালবাসার পরিবর্তে এখনো ক্ষোভ-অভিমান জমে আছে
কিনা!! শুধু জানি আমাকে ভেবে ভেবে অনেক কষ্ট পেয়েছ!! আমাকে ভেবে ভেবে
অঝোরে দুচোখের জল ফেলেছ!! আমাকে ভেবে বিনিদ্র রজনী পার করেছ!! ফোনের পর ফোন
আর ম্যাসেজের পর ম্যাসেজ এর পরেও কোন সাড়া পাওনি!! শুধু অপেক্ষা আর
অপেক্ষা!!
অথচ আমি অতি সহজেই তোমাকে ভুলে যেতে পারলাম.... এটাই
তোমার বদ্ধমূল ধারণা হয়ে গড়ে উঠেছে!! কিন্তু বিশ্বাস কর.. তোমাকে ছাড়া আমার
একমুহূর্তও সুখে কাটেনি!! হৃদয়ের প্রতিটি জায়গায় সর্বদা একমাত্র তোমার
ছবিই ভেসে থাকত, এখনো ভেসে উঠে!!
রাতের বেলায় তোমার পাঠানো
ম্যাসেজগুলো বার বার পড়েছি আর দুচোখ দিয়ে ঝর্নাধারা প্রবাহিত করেছি !!
পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় যখন চারিদিকে আলোকিত থাকত তখনো আমার মন অমাবস্যার
গহীন অন্ধকারে ঢেকে থাকত!!
সেদিন তোমার সাথে দেখা করে রুমে এসে
জানতে পারলাম, আমার বাবা খুব অসুস্থ!! বাসা থেকে আমাকে অনেকবার ফোন করেছে
কিন্তু ফোন বন্ধ থাকায় আমার সাথে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়ে অবশেষে রুমমেটকে
বাবার অসুস্থতার খবর জানিয়েছে!! সেই রাতেই আমি বাড়ির উদ্দেশ্যে চলে
গিয়েছিলাম।
পরেরদিন ভোরে যখন পোঁছালাম তখন বাবার অবস্থা অনেক খারাপ!
তার পাশে রাখা কাগজ দেখে বুঝতে পারলাম উনার হ্যার্ট এট্যাক হয়েছে! বাবা
আমাকে অনেক ভালবাসে, আমিও বাবাকে নিজের জীবনের চেয়েও বেশী ভালবাসি, সম্মান
করি! আমি আমার বাবার চোখের মণি!!
আমাকে দেখেই বাবা যেন সস্থি ফিরে
পেল, অসুস্থ থেকে একদিনেই অনেকটা সুস্থ হয়ে উঠল! বিকেলে আমাকে কাছে ডেকে
নিয়ে বলেছিল, তার অনেক দিনের ইচ্ছে আমার সাথে তার বন্ধুর মেয়ের বিয়ে দিবে!
বন্ধুর মৃত্যুর সময় নাকি তিনি হাত ধরে কথা দিয়েছিলেন তাকে!!
কথাগুলো
শুনে আমার মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়েছিল! একদিকে আমার হৃদয়ে গড়ে উঠা স্বপ্নের
রানী, অন্যদিকে আমার প্রাণপ্রীয় বাবা!! পরিস্থিতি আমাকে বাধ্য করে তার
সবকিছুকে মেনে নিতে!!
তুমিতো ভালভাবেই জানো একজন MI পেশেন্টের সুস্থ হওয়ার অন্যতম উপায় তাকে টেনশন ফ্রি রাখা!
আমি চেয়েছিলাম তোমার জীবনকে সুন্দর ও সুখি দেখতে! আমাকে ভেবে ভেবে তুমি
যেন তোমার জীবনকে ধ্বংস করে না দাও এজন্যই সেদিন তোমার সাথে অনেক খারাপ
ব্যাবহার করেছিলাম!! যদি পার ক্ষমা করে দিও!!
এরপরেও সর্বদা শুধু
তোমাকেই ভাবতাম! তোমার সাথে কাটানো সুখের স্মৃতিগুলোকে আকড়ে ধরে বেচে
থাকতাম!
এভাবে কেটে যায় ২ বছর। একদিন শুনতে পেলাম বাবার সেই বন্ধুর মেয়েটি
তার প্রেমিককে বিয়ে করেছে।
সেদিন নিজেকে অনেক ভাগ্যবান মনে হয়েছিল!!
একজনকে হৃদয়ে স্থান দিয়ে অন্যজনের সাথে সারা জীবন অভিনয় করে যাওয়া থেকে
মুক্তি পাওয়ার আনন্দ! হয়তো সেদিন তোমার কাছে ফিরে আসতে পারতাম কিন্তু সেদিন
আমি তোমার ভালবাসাকে নতুনভাবে কলঙ্কিত করতে চায়নি!!
এরপরে কেটে
গেছে আরও ৫টি বছর!! হঠাৎ একদিন BSMMU এর লাইব্রেরীতে তোমাকে দেখতে পায়! এক
কলিগের কাছে জানতে পারি তুমিও আমার মতো এখানে ট্রেনিং করছ। কিন্তু শুনে
অবাক হয় যে, তুমি তোমার প্রীয় মেডিসিনে চাঞ্চ পাওয়ার পরেও ভর্তি হওনি,
ভর্তি হয়েছ আমার প্রীয় বিষয় সার্জারিতে!! যেমন আমি ভর্তি হয়েছি তোমার
পছন্দের মেডিসিনে!! তার থেকেও বেশী অবাক হয়েছি, এখনো তুমি আমার মতো বিয়ে
করনি, একথা শুনে!!
তোমাকে এভাবে দেখব কখনো কল্পনাও করতে পারিনি!
তোমাকে এভাবে দেখার পর থেকে নিজেকে ধরে রাখতে পারিনি!! সেদিন সারা রাত শুধু
তোমাকে নিয়ে ভেবেছি!! বিনিদ্র রজনী কাটিয়েছি! অনেক ভেবে আরেকটি সিদ্ধান্ত
নিয়ে ফেলেছি! নতুন করে বাচার সিদ্ধান্ত, নতুন করে জীবন গড়ার সিদ্ধান্ত!
এভাবে ভালবেসে ধুকে ধুকে মরার চেয়ে আমরা কি পারিনা আমাদের জীবনকে সজীবতা
দান করতে?? নতুন করে সবপ্ন দেখতে?? ভালবাসার পূর্নতা দিতে??? দুঃখের
স্মৃতিগুলোকে মুছে ফেলতে??
সন্ধায় তোমার অপেক্ষায় রইলাম, যেখানে
আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল! যেখানে আমাদের প্রেমের সূচনা হয়েছিল! যেখানে
দুজন জীবনকে নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখেছিলাম!! যেখানে আমাদের সর্বশেষ
দেখা হয়েছিল!!
অপেক্ষায় রইলাম তোমার আগমনের..... নতুন জীবনের ......
ইতি
তোমার তাসনিম"
চিঠিটি পড়েই নিশাতের চোখদিয়ে আনন্দ অশ্রু বইতে শুরু করেছে।
এ যেন জীবনে সমস্ত আশার প্রদীপ নিভে গিয়ে হটাৎ জ্বলে উঠা কোন সূর্য! আকস্মিক কোন অন্ধকার গুহা থেকে স্বপ্নপুরীতে পদার্পণ !!
পূর্ণিমার চাঁদের স্নিগ্ধ আলোয় আলোকিত চারিদিক। শহীদ মিনারের পাদদেশে বসে আছে নিশাত আর তাসনিম !
স্নিগ্ধ আলোর আভায় নিশাতের মায়াবী চেহারা আরো মনোহরণীয় হয়ে উঠছে । ঠোঁটের
কোনে লেগে থাকা মিষ্টি হাসি হৃদয়ে আনন্দের জোয়ার সৃষ্টি করছে। হরিণের মতো
মায়াবী চোখদুটির উপর তাসনিমের চোখ স্থীর হয়ে আছে। মাঝে মাঝে দক্ষিণা
বাতাসে নিশাতের চুলগুলো উড়ছে।
বেদিতে রাখা নিশাতের হাত আকড়ে ধরে
তাসনিম! দুজনের সারা শরীরে কেমন যেন এক অনুভূতির সৃষ্টি হয়! বুকের মাঝে জমে
থাকা বরফ মুহূর্তেই উবে যায়! জেগে উঠে, সমস্ত দুঃখ ভুলে সামনের দিকে এগিয়ে
যাওয়ার অদম্য বাসনা! দুজনের চোখে ভেসে উঠে নতুন স্বপ্ন!